মুঠির ওপারে, শত্রু দাঁড়িয়ে আছে!
মধুরূপা, আকর্ষণীয় স্কুলছাত্রী হোক কিংবা মানুষের চামড়া পরে থাকা ভয়াল দৈত্য, অথবা ভয়াল চেহারার রাক্ষস—কিছুই আছর ফেলতে পারে না আশিয়া রিয়োর লৌহকঠিন মুষ্ঠির ওপর। মুষ্টির ওপারে থাকে শত্রু—তার প্রাণের হুমকি হয়ে দাঁড়ানো মৃত্যুশত্রু। এই একটি কথাই তার মনে গেঁথে নিলেই যথেষ্ট।
তার ভারী মুষ্টি গিয়ে পড়ল সেই নিষ্পাপ, স্নিগ্ধ মুখাবয়বে; যেন এক বিশাল হাতুড়ি এসে কঠোরভাবে তার নাক গুঁড়িয়ে দিল। গভীরভাবে বসে গেল সেই মুখে, এমনকি আঁধার কালো চোখের কোটরও চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে গেল। বলা চলে, এক মুহূর্তেই তার সেই পবিত্র, সুন্দর মুখ বিকৃত হয়ে গেল, আর কখনও আগের মতো হয়ে ওঠার উপায় রইল না।
তবুও, কোথাও একফোঁটা রক্তও ঝরল না।
গর্জন—!
সম্পূর্ণ কালো এক ভয়ানক বাঘ যেন বাস্তব হয়ে রূপ নিল; তীক্ষ্ণ নখর বাড়িয়ে সে মেয়েটির মুখে রেখে গেল বাঘের পাঞ্জা সদৃশ দাগ। "দক্ষ" স্তরের ‘বক্ষস্থলে ভয়াল বাঘ’ কেবল মানসিক সন্ত্রাসই নয়, বাস্তব ক্ষতিও করে। বিশাল বাঘশির নিচু করে সে আবার ঝাঁপিয়ে পড়ল, এক দলা কালো ধোঁয়া ছিঁড়ে তুলল। যেন টাটকা শিকার গিলছে, কালো বাঘটি গর্বভরে মাথা উঁচু করে সেই কালো ধোঁয়ার গুচ্ছ গিলে ফেলল।
[‘বক্ষস্থলে ভয়াল বাঘ’ দক্ষতা +৩!]
বাঘের পিতলের ঘণ্টার মতো চোখে হিংস্রতা আরও বেড়ে উঠল।
ক্ষীণকায় মেয়েটি যেন ছিন্ন-ভিন্ন বস্তার মতো গিয়ে আছড়ে পড়ল দেয়ালে। তারপর ধীরে ধীরে দেয়াল বেয়ে নিচে গড়িয়ে পড়ল।
আশিয়া রিয়ো মুষ্ঠি গুটিয়ে নিল; মুষ্টিতে মৃদু ব্যথা, যদিও এই প্রাণীর হাড় এতটাই ভঙ্গুর, তবুও প্রতিঘাতের শক্তি সহ্য করা সহজ নয়।
‘শেষ?’
‘না, মোটেই না!’
কালো ধোঁয়া মেঝেতে গড়িয়ে, ছড়িয়ে গিয়ে ধীরে ধীরে জালের মতো আকৃতি নিচ্ছে, ঘরের চারদিক ঢেকে ফেলছে।
চাপ—
এক অজানা, ভয়াল চাপ!
সামনের মুহূর্তের তুলনায় অনেক বেশি শক্তিশালী, এই ছোট্ট ঘরের দেয়াল যেন বিশাল পাহাড় হয়ে আশিয়া রিয়োর দিকে এগিয়ে আসছে। এমনকি ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা চটিজুতো, ছড়ানো কমিক বই, অপরিষ্কার খাবারের বাক্স, ডাস্টবিনের কাগজ—সবই যেন ভয়াবহ দৈত্যে রূপান্তরিত হয়ে ছায়ার ভেতর জন্ম নিচ্ছে, ছোট্ট জিভ, সূচালো দাঁত বের করে চিৎকার করতে করতে তার দিকে ছুটে আসছে।
নড়তে পারছে না?
আশিয়া রিয়োর দেহ কোনো অদৃশ্য শক্তি দিয়ে আটকে গেছে। কালো ধোঁয়া শিকলের মতো বাঘের দেহ বেঁধে ফেলেছে।
আর তার সামনেই, মুখভাঙা মেয়েটি যুক্তিহীন ভঙ্গিতে আবার উঠে দাঁড়াল।
ঠিক উঠে দাঁড়ানো নয়, বরং কালো ধোঁয়ার জোরে ভেসে উঠল যেন।
বাঁকা হাত কচর কচর শব্দে, যেন খেলনার পুতুলের মতো, খামচে ধরে টেনে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনা হল—অন্তত ওপর থেকে স্বাভাবিক মনে হয়।
কালো ধোঁয়া জীবন্ত সত্তার মতো তার গুঁড়িয়ে যাওয়া মুখ ঢেকে, মরিয়া হয়ে মেরামত করছে।
সে আশিয়া রিয়োর দিকে এগিয়ে এল, কাঠিন্যপূর্ন পদক্ষেপে।
ঠোঁটে ভাঙচুর করা হাসি, লোভাতুর দৃষ্টি।
‘একটি সুযোগ, শুধুই একটি!’
মরণফাঁদে পড়েও আশিয়া রিয়ো শান্ত, স্থির।
অজানা এক শূন্যতায় ডুবে গেছে মন।
‘এসো, এসো!’
তার শরীরের সব শক্তি, কঠোর অনুশীলনে গড়া প্রতিটি পেশি, বারবার শাণিত মানসিক বল, ইস্পাত-দৃঢ় সংকল্প—সবই একত্রিত হয়ে উঠল।
নিশ্ছিদ্র কালো বাঘের পেশিও টানটান, দেহ যেন আরও বিস্তৃত, শিকল ছিঁড়তে মরিয়া।
সে স্বাধীন!
শক্তি চূড়ান্তে পৌঁছতেই আশিয়া রিয়ো চোখ মেলে ধরল।
পাহাড়সম চাপ চেপে ধরলেও সে দেহ ঘুরিয়ে, ঘুষি ছুঁড়ল!
“বিস্ফোরণ!”
এই ঘুষিতে বাতাস কেঁপে উঠল।
বজ্রগর্জন, ঝড়ের মতো—বাঘ নেমে এল পাহাড় থেকে!
কিন্তু আশিয়া রিয়োর লক্ষ্য তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা অদ্ভুত মেয়েটি নয়, বরং পেছনের অন্ধকার ছায়ায় লুকিয়ে থাকা এক বিন্দু।
মুষ্ঠি মাংস ভেদ করল, পাঁজর ভাঙল, সরাসরি এক সজীব হৃদয়ে গিয়ে বিঁধল—একেবারে ফেটে গেল সেটা।
রক্ত ছিটিয়ে, মাংস ছড়িয়ে পড়ল চারদিকে।
ছায়ার মধ্যে, আগের সেই নিষ্ঠুর চোখ, হাতে ছুরি ধরা মেয়েটির দৃষ্টি ধীরে ধীরে নিস্তেজ হলো।
অবিশ্বাসে সে আশিয়া রিয়োর দিকে তাকাল, যেন এক দৈত্যকে দেখছে।
“তুমি... কখন?”
“ধ্বংস!”
অভ্যন্তরীণ শক্তি বিস্ফোরিত হয়ে তার দেহের সমস্ত অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দিল।
আর কোনো কথা জিজ্ঞাসা করার সুযোগ রইল না, নিজের পরিচয় জানানোর সময়ও পেল না—চিরতরে নিশ্চুপ।
আর সেই পুতুলসদৃশ মেয়েটি, আশিয়া রিয়োকে ছোঁয়ার ঠিক আগমুহূর্তে হঠাৎই থেমে গেল, একেবারে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
কালো ধোঁয়া ঢেউয়ের মতো সরে যেতে লাগল।
——————————
“রিয়ো! তুমি ঠিক আছ তো?”
অকুতোভয় আকাবানে ইউতা ছুটে এসে যা দেখল—
চাঁদের আলো মেঘ ফুঁড়ে জানালা দিয়ে ঢুকেছে, আশিয়া রিয়োর গায়ের ওপর পড়ছে।
সুদর্শন কিশোরটি দেয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে, চোখ বন্ধ, শ্বাসপ্রশ্বাস শান্ত, রূপ যেন রৌপ্য জ্যোৎস্নায় আরও পবিত্র হয়ে উঠেছে।
এ যেন দেবতুল্য সৌন্দর্য।
কিন্তু দেয়ালের গাঢ় গর্তে রক্তের ছোপ, চারপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে।
কাছে, বিভ্রান্ত বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া ছেলেটি অসাড় দৃষ্টিতে সামনে তাকিয়ে, কথাও বলতে পারছে না।
মাটিতে পড়ে আছে দুটি কিশোরীর মৃতদেহ, রক্তমাংস ছড়িয়ে, যেন বিকশিত রক্তের ফুল—কিশোরের কাপড়, মুষ্ঠিতে লালচে রক্ত, এক নজরেই বোঝা যায়, কে এর কারণ।
এ যেন রক্তক্ষেত্রের দৃশ্য!
“রিয়ো, তুমি সত্যিই দেবতা... না কি রক্তপিপাসু যতন?”
আকাবানে ইউতা মৃদু দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল, তারপর দ্রুত নেমে পড়ল পরিস্থিতি সামলাতে।
প্রথমেই সে আশিয়া রিয়োর অবস্থা পরীক্ষা করল—শুধু ক্লান্তি ছাড়া গুরুতর কিছু নয়, ডানহাতে হয়তো সামান্য আঘাত আছে।
কিন্তু পাশে থাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রটি বেশ খারাপ অবস্থায়।
আশিয়া রিয়োর সাহসী হস্তক্ষেপে সে প্রাণে বেঁচে গেলেও, অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ ও মানসিক আঘাতে চরম ক্ষতিগ্রস্ত—বিশেষ চিকিৎসা প্রয়োজন।
সবচেয়ে খারাপ অবস্থা তার নিম্নাঙ্গে।
দুঃখজনকভাবে, ছেলেটি বোধহয় আর কখনো পুরুষত্বের পরিচয় রাখতে পারবে না।
তবু, প্রাণে বেঁচে যাওয়াই সৌভাগ্য।
“এছাড়াও...”
আকাবানে ইউতা নিচু হয়ে দুটি মৃতদেহ দেখল—একজন অনেক আগেই মারা গেছে, অন্যজন চরম বলপ্রয়োগে প্রাণ হারিয়েছে।
এই একটি ঘুষির শক্তি দেখে সে নিজেরও গা শিউরে উঠল, নিদ্রামগ্ন আশিয়া রিয়োর দিকে তাকাল—এত দ্রুত সে কীভাবে এতটা শক্তিশালী হয়ে উঠল!
তাদের শরীরে পরিচিত এক গন্ধ পেল ইউতা, ভ্রু কুঁচকে গেল।
“আবারও শান্তি নষ্ট হলো...”
এই কাণ্ডে অ্যাপার্টমেন্টের অনেকে নড়েচড়ে উঠল, তবে কৌতূহলী কেবল কুয়াশিতাকি দাইকি।
বৃদ্ধটি নিজের সীমাবদ্ধতা জানে, শুধু পুলিশ ডাকল, সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে থাকল, সামনে যেতে সাহস পেল না—তাঁর এই বয়সে যদি বিপদ ঘটে, সামলানো সম্ভব নয়। একটু আগে ইউতা সিঁড়িতে উঠতে উঠতে তাঁকে সাবধান করেছিল।
তাই বড় কোনো অশান্তি হয়নি।
না হলে কেউ যদি এই দৃশ্য দেখে ফেলত, বড় ঝামেলা হয়ে যেত।
“বিপ বিপ—বিপ বিপ—”
অধিকাংশ অ্যানিমের মতোই, পুলিশ সবশেষে আসে।
নেতৃস্থানীয় অফিসার সিঁড়ি বেয়ে সাবধানে এগিয়ে এল।
এই সময়ে পুলিশ হওয়া চরম দুরূহ; ছোটখাটো বিষয় থেকে শুরু করে বিপজ্জনক অপরাধ, সব সামলাতে হয়, কখনো আবার অপরাধীদের ভয়েও থাকতে হয়, জনসাধারণের অবজ্ঞা সইতে হয়, ঝুঁকিও থাকে।
বেতনও খুব বেশি নয়।
ভাবলে বোঝা যায় কেন এ দেশে পুলিশের দক্ষতা কম।
আকাবানে ইউতাকে দেখে পুলিশ সঙ্গে সঙ্গে গম্ভীর, শ্রদ্ধাশীল হয়ে মাথা নিচু করল।
“আকাবানে পরামর্শদাতা, শুভরাত্রি!”
আকাবানে ইউতা মৃদু হাসল, “শুভরাত্রি, আমি তোমাকে এখানে যা ঘটেছে, বিস্তারিত বলি...”