একত্রিশতম অধ্যায় রাজধনী
নিয়ম—এটাই এই বিশ্বের ভিত্তি। কিন্তু, যখন কেউ অশুভ শক্তিতে রূপান্তরিত হয়, তখন এমনিতেই নড়বড়ে এই নিয়ম আরও দুর্বল হয়ে পড়ে, গোটা বিশ্ব যেন ভেঙে পড়ার মুখে দাঁড়ায়। অথচ, এই মুহূর্তে শূর্য যথেষ্ট শক্তিশালী নয় তার সঙ্গে পাল্লা দিতে। তাছাড়া, শূর্য যদি এখনই সমানে সমানে পারতও, নিশ্চিত নয় সে আদৌ তার বিরোধিতা করত কিনা।
আতা তার মালিকের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল, মনের মধ্যে ক্লান্তি জমে আছে।
ঈশ্বরের জগতে, সময়ের কোনও মূল্য নেই। এক মুহূর্তেই যুগ পাল্টে যেতে পারে।
নিঃশব্দ দেবতাটোর চূড়ায়, বরফে ঢাকা মঞ্চের ওপর, বহুদিন ঘুমিয়ে থাকা এক নারী, শূর্যের নিবিড় দৃষ্টির মাঝে ধীরে ধীরে চোখ মেলল।
— ঠান্ডা...— ঘুম আর নিদ্রার মধ্যে পার্থক্য আছে, আজকের দিন, আগের মতো নয়।
— ঠান্ডা?— শূর্য একটু থমকে গেল। হঠাৎই মনে পড়ল, এখন নেহা সাধারণ মানুষের মতোই দুর্বল, কারণ তার শক্তি রুদ্ধ। সে দ্রুত নেহাকে বুকে জড়িয়ে, মুহূর্তে দেবতাটা ছেড়ে, বুনো প্রান্তরে এসে নামল।
বুনো প্রান্তরে রোদের ঝলকানি, উষ্ণতা চারপাশে। নেহার শরীরে একদম শক্তি নেই, তাই সেই পুরুষের কোলে নিশ্চুপ পড়ে রইল, যে তার ঘুমের সময়ে একবার-দুবার নয়, বহুবার তাকে দেখেছে।
তবে ভাগ্য ভালো, এই বাহুডোর বেশ উষ্ণ, রোদও গা জুড়ানো, তার বরফশীতল হাত-পা একটু উষ্ণতা পেল।
শূর্য নেহাকে বুকে নিয়ে, রোদের প্রাচুর্য যেখানে, সেখানে বসে পড়ল।
ক্লান্ত ও বিশ্বস্ত টাওয়ারের আত্মা, মালিকের চাপে, আবার বরফ গলিয়ে জল বানাচ্ছে। আর একপ্রান্তে নরকের আগুনে ফুটছে জল।
আতা গরম জল এনে দিল তাদের সামনে।
শূর্য নেহার অবস্থান একটু পাল্টে নিয়ে কোমল স্বরে বলল, — এভাবে থাকলে কষ্ট হচ্ছে?
নেহা মাথা নেড়ে জানাল, — না।
শূর্য হাসল, মমতায় ভরা। সযত্নে তার মুখ, হাত মুছে দিল। তারপর নেহার খালি পা গরম পানিতে ডুবিয়ে দিল।
— আতা বলল, আমাদের শক্তির সংঘাত হয়, আর এখন তোমার শরীর দেবশক্তি সইতে পারে না, তাই এইভাবে হাত-পা উষ্ণ করছি,— শূর্য ব্যাখ্যা করল, মুখে অনুরাগের হাসি।
পায়ের পাতা থেকে মৃদু উষ্ণতা হৃদয় ছুঁয়ে গেল। নেহা দৃষ্টিটা অনন্তের দিগন্ত থেকে ফিরিয়ে এনে পুরুষটির মুখের ওপর স্থির করল।
তার মুখশ্রী, অতীব নয়নাভিরাম নয়, বরং খানিক রুক্ষতা, খানিক সাহস, খানিক সৌন্দর্য আর আরাম মিশে আছে। বাড়তি স্বাধীনচেতা ভাবও আছে। সংক্ষেপে, সাধারণ কিন্তু আরামদায়ক।
তবে সাধারণতুল্য হলেও, নেহা অনেক সুপুরুষ দেখেছে বলে তেমন প্রভাব পড়ে না।
— দেখতে কেমন?— শূর্য তার পা তুলে মুছিয়ে, উষ্ণ জুতো পরিয়ে দিল। নেহার বিস্মিত দৃষ্টি দেখে, রসিকতা করল।
সত্যি বলতে, খারাপ নয়, আরামদায়ক লাগে। তবে মুখ ফুটে সে বলল না, জানে এই পুরুষ সুযোগ পেলেই আরও বাড়াবাড়ি করবে।
শূর্য তার নীরবতায় কিছু মনে করল না।
— পাঁচ মহাদেশ, কোনটা তোমার বেশি পছন্দ? এখন তো তুমি দেবতাটায় থাকতে পারবে না, চল কোথাও গিয়ে অস্থায়ী আশ্রয় নিই, যতদিন না তুমি সেরে ওঠো।
কোন মহাদেশ?
— মধ্যভূমি ভালো,— মনে পড়ল, আগের দেখা কিছু দৃশ্যেরা। সেখানে নিশ্চয়ই চমৎকার কিছু ঘটবে।
নেহার দৃষ্টি স্ফুলিঙ্গের মতো ঝলমলে, একটু ছলনা মেশানো।
— মধ্যভূমির রাজপুরী। এতদিন আমাকে দেখেছ, এবার আমিই তোমাকে চমৎকার এক নাটক দেখাবো,— দুর্বল শরীরের নেহার কণ্ঠে ছিল কিশোরী লজ্জা।
মধ্যভূমি, রাজপুরী।
সত্যি বলতে, পাঁচ মহাদেশের বিভিন্ন পরিবার আর শক্তিগুলোর দৃষ্টিতে এ জায়গার গুরুত্ব অদ্ভুত। একদিকে, রাজপুরীর রাজবংশ বহুদিন ধরে পাঁচ মহাদেশ শাসন করছে, তবু কেউ তাদের বিশেষ সমীহ করে না, কেউ কেউ তো প্রকাশ্যেই অবজ্ঞা করে।
তবু আবার, বছরের শেষে সবাই উপঢৌকন পাঠায়। শ্রেষ্ঠ পরিবারের সম্পদ অবিরত বয়ে আসে রাজপুরীর ঘরে।
এই দ্বৈত আচরণ রহস্যময়।
রাজপুরীর সবচেয়ে বিখ্যাত স্থান রাজকীয় ক্যাসিনো।
রাজকীয় ক্যাসিনোতে বাজি ধরা হয় সম্পদ, মানুষ, জীবন—কিন্তু অর্থ নয়।
কেউ এখানে রাতারাতি ভাগ্যবান হয়, কেউ চিরতরে নিঃস্ব। এই টানাপোড়েনের স্বাদ নিজেকেই নিতে হয়।
তবুও, ভবিষ্যৎ অজানা—সম্ভবত স্বর্ণালী, সম্ভবত ভয়াবহ—তবু মানুষ এখানে ছুটে আসে।
— এই ক্যাসিনোটা বেশ মজার জায়গা,— শূর্য মনোযোগ দিয়ে ভৃত্যের মুখে রাজপুরীর গল্প শুনে আগ্রহী হলো।
সে নেহাকে নিয়ে রাজপুরীতে উপযুক্ত ছোট্ট বাড়ি কিনল, যেখানে আছে সবকিছু—বাগান, বারান্দা, জলাশয়।
— যেতে চাও?— নেহা প্রথমে মনে করেছিল, শূর্যকে একটু খোঁচা দেবে, কিন্তু খেয়াল করল, এসব তার জন্য নতুন। মুখের কথা বদলে গেল।
শূর্য একগাল হাসল। সে কি তবে তার খেয়ালে নাহার সঙ্গে মানিয়ে নিচ্ছে? মনে মনে আনন্দে চঞ্চল, সে বারবার মাথা নাড়ল, — এ জগতের কিছুই দেখিনি তো!
তার হাসি এত উজ্জ্বল, দেখে মনে হয় হৃদয় কেঁপে ওঠে। নেহা লজ্জায় চোখ ফিরিয়ে নিল, — চল, ঘুরে আসি।
— ঠিক আছে,— শূর্য ভেতরে উচ্ছ্বসিত, মুখে শান্ত, দৃষ্টি গভীর।
বাইরে বেরোতে হলে স্বাভাবিকভাবেই ছদ্মবেশ নিতে হয়।
শূর্য নেহার অপরূপ মুখের দিকে তাকিয়ে, নিঃশব্দ দেবতাটার ভেতরে মুখ ঢাকার কিছু খুঁজতে লাগল।
সম্প্রতি সে কিছু উপন্যাস পড়েছে, যেখানে সুন্দরী নারীরা বাইরে গেলে দস্যুরা উত্যক্ত করে। তার নেহা এত সুন্দরী, কাউকে দেখতে দেওয়া যায় না।
— পরব না!— নেহা বিরক্তির সঙ্গে বলল, শূর্য যে মুখোশ বা আস্তরণ বের করেছে সেটা দেখে। কেন সে এত বিশ্রী জিনিস পরবে?
এবার শূর্য জেদ ধরে বসল, কিছুতেই ছাড়বে না।
— তুমি ভাবছ, আমার শক্তি নেই বলে এখন সব তোমার ইচ্ছায় চলবে?— নেহার কণ্ঠে বিরক্তি, কপালে অন্ধকার ছায়া। — এখন থেকে সব নিয়ন্ত্রণ করবে?
শূর্য কষ্ট পেল, — আমি কেবল চাই না, অন্য কেউ তোমাকে দেখুক।
রাগী নারীরা যুক্তি মানে না, তা সে যত উচ্চ অবস্থারই হোক।
— আমি কি খুব কুৎসিত, কাউকে দেখাতে পারি না?
— না, তুমি খুব সুন্দর!
— তাহলে আমি কেন এত কুৎসিত জিনিস পরব?
— কারণ, আমি চাই না অন্যরা তোমাকে দেখুক।
— তাহলে তো আবারও তুমি বলছ আমি কুৎসিত!— নেহার কণ্ঠে বিষণ্নতা।
আতা বুঝতে পারল না, এদের এত তুচ্ছ বিষয় নিয়ে ঝগড়া করার মানে কী।
মানুষ হওয়ার আনন্দ কি এটাই?
— তুমি সত্যিই সুন্দর,— শূর্য গম্ভীর কণ্ঠে বলল,— তাই আমি শুধু একলাই দেখতে চাই, অন্য কেউ নয়।
... এই লোকটা সম্ভবত নরকের আগুনে মাথা খুইয়ে ফেলেছে। নেহা মুখ গম্ভীর করে হাঁটা দিল।
কয়েক কদম গিয়ে, আবার ফিরে এসে সেই মুখোশ তুলে নিল।
এভাবেই তো তাকে রাখতেই হয়!
শূর্য পিছনে দাঁড়িয়ে, তার লজ্জায় ছুটে যাওয়া মূর্তিকে দেখে মৃদু হাসল।
তার লজ্জার মুহূর্তটা—কত যে মধুর!
...
মালিকটা বড্ড বোকা!