সপ্তত্রিশতম অধ্যায়: মুখোমুখি সত্য উদ্ঘাটন
আমি নির্বিকার মুখে বললাম, ‘‘মুখে বলা কোনো প্রমাণ নয়, তুমি কি আমার সঙ্গে গিয়ে শেন ইয়োউনানের সামনে দাঁড়িয়ে সত্যিটা যাচাই করতে সাহস করো? ঠিক এই মুহূর্তেই সে ইংরেজি চত্বরে এসেছে!’’
ঝু হানের মুখ মুহূর্তেই থমকে গেল, তার গুজব ছড়ানোর জীবনে কেউই কখনো তাকে এভাবে ধরে নিয়ে সত্য যাচাই করতে বলেনি।
আমি তাকে একটুও পিছু হটবার সুযোগ দিলাম না, ‘‘কী হলো? বলার সাহস আছে অথচ সামনে গিয়ে সত্যি যাচাই করতে পারো না? তুমি যদি যেতে না চাও, তাহলে এখানেই জোরে দশবার বলো: ‘আমি একজন মিথ্যে ছড়ানো, বিষাক্ত কানাঘুষোর উসকানিকারী।’ ’’
আমার কথায় আশেপাশের সকলে উৎসাহিত হয়ে উঠল, চিৎকার করতে লাগল, ‘‘চল, ওর সঙ্গে যাও!’’
‘‘ভয় কিসের, যাও না!’’
‘‘তুমি যদি ভয় পাও, তবে নিশ্চয়ই মিথ্যে বলছ!’’
‘‘কাপুরুষ…’’
ঝু হানের মুখ আরও কঠিন হয়ে উঠল, যেনো সুযোগ পেলে আমাকে এক গিলে খেত।
‘‘এখানে, এখানে,’’ ওয়েন লিলি শেন ইয়োউনানকে নিয়ে ভিড় ঠেলে সামনে এলো।
সে একটু দূরে ছিল আর এখনো পুরো ঘটনা কী হচ্ছে বুঝতে পারেনি, তবে তাতে কিছু আসে যায় না, সে শুধু সত্যটা বললেই চলবে।
ঝু হানের মুখ আরও বিবর্ণ হয়ে গেল, মৃত মানুষের মতো।
আমি ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসির রেখা নিয়ে তার দিকে তাকালাম, তারপর সোজা শেন ইয়োউনানের সামনে গিয়ে বললাম, ‘‘শেন ইয়োউনান, সম্প্রতি আমার আর তোমার নাম নিয়ে অনেক গুজব রটেছে, এখন আমি কয়েকটা প্রশ্ন করব, তুমি শুধু সত্যটা বলবে।’’
সে চুপচাপ, চোখে বিরক্তির ছাপ নিয়ে আমার দিকে তাকাল।
সে যতই বিরক্ত হোক, এখন আমি থামতে পারি না—এটা আমার সম্মানের প্রশ্ন; এতদিনে আর কোনো অজানা অপবাদ নিতে পারি না।
শেন ইয়োউনান রাগে বেরিয়ে যাবার আগেই আমি সরাসরি জিজ্ঞেস করলাম, ‘‘লোকজন বলছে, আমি নাকি রসায়নের ক্লাসে সুযোগ পেয়ে তোমার হাত ধরেছিলাম? এটা কি সত্যি? সত্যটা বলো।’’
পাশের জনতা আমার প্রশ্ন শুনে হাসতে শুরু করল।
সে চুপ করে রইল; সে কী ভাবছে জানি না, কিন্তু আমার বুক ধুকধুক করছে—সে যদি কোনো বিরূপ কথা বলে, আমাকে হয়তো স্কুল ছেড়ে চলে যেতে হবে।
আমি আশায় ভরা চোখে তার দিকে তাকালাম। সে অবজ্ঞার দৃষ্টিতে আমাকেই দেখল, ‘‘না।’’
আমি স্বস্তির নিশ্বাস ফেললাম। শেন ইয়োউনান আমার প্রতি যা-ই ভাবুক, অন্তত সে মিথ্যে বলেনি।
সব কাজের শুরু কঠিন, আজকে প্রথম পদক্ষেপটা ভালো হয়েছে। আমি আত্মবিশ্বাসী হয়ে আবার জিজ্ঞেস করলাম, ‘‘লোকজন বলছে, আমি নাকি তোমার জন্য মাঠে পানীয় নিয়ে গিয়েছিলাম? এটা কি সত্যি?’’
তার মুখ অন্ধকার হয়ে গেল, ‘‘না!’’
আমি লজ্জা ছাড়িয়ে, চারপাশের হাসি-ঠাট্টা উপেক্ষা করে আবার বললাম, ‘‘তাহলে আমি কি কখনো তোমাকে অনুসরণ করেছি, কিংবা তোমার বাড়ি গিয়েছিলাম?’’
‘‘না! আমার সঙ্গে তোমার কোনো সম্পর্ক নেই!’’ সে দাঁত চেপে বলল, প্রচণ্ড রাগে ফুঁসছে।
তার রাগের কারণ বুঝতে পারলাম না, তবু আন্তরিকভাবে বললাম, ‘‘ধন্যবাদ।’’
শেন ইয়োউনান রাগে মুখ কালো করে, কারো দিকে না তাকিয়ে ভিড় ঠেলে চলে গেল।
প্রথম পদক্ষেপ সফল হলো, চারপাশে হাসি ও আলোচনা চলছেই।
‘‘তাহলে তো সবই গুজব ছিল।’’
‘‘অবিশ্বাস্য, ও বলল গুজবটা পাশের মেয়েটিই ছড়িয়েছে—ভীষণ নিষ্ঠুর!’’
‘‘সত্যিই তো—সবচেয়ে ভয়ংকর নারীর মন।’’
‘‘সে তো আসলেই বিষধর মহিলা।’’
আমি কিছু বলার আগেই ঝু হানকে চারপাশের সবাই কথা দিয়ে ছিন্নভিন্ন করে দিল, আর যারা এসব বলছে, বেশিরভাগই ছেলেরা। হয়তো মেয়েরা গুজব ছড়ানোর অংশ ছিল বলে এখন চুপচাপ আছে।
‘‘কিছু লোকের উচিত নিজেদের মুখ ও চরিত্র নিয়ে একটু ভাবা,’’ আমি ঝু হানের মুখ দেখে মনে মনে খুশি হলাম—এখন যদি তাকে একহাত না নিই, তাহলে কখন নেব?
কিন্তু ঝু হান এমনই, সে যমের সামনে গিয়েও কাঁদে না, কেবল মাটিচাপা পড়ারই যোগ্য।
দেখো, সে আবার নতুন এক ঘটনা নিয়ে এল।
‘‘তুমি শেন ইয়োউনানকে হয়তো বিরক্ত করোনি, কিন্তু তুমি অশ্লীল ছবি ছড়িয়েছ, লু হুই-কে স্কুল ছাড়তে বাধ্য করেছ—তাতেও তো মানুষের ঘৃণা পাও!’
তুমি যা খুশি বলো, আমি তা নিয়ে মোটেই ভয় পাই না। আমি তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে বললাম, ‘‘ঝু হান, শুধু নিজের পদবির সঙ্গে শুয়োরের নাম থাকলেই শুয়োরের মতো বোকা হওয়া উচিত নয়। আর যদি হয়েই যাও, অন্ততপক্ষে নিজের বুদ্ধিমত্তা শুয়োরের মানে নামিয়ে এনো না—তুমি তো মানুষ, তাই না?’’
চারপাশে হাসির রোল উঠল। তার মিথ্যে ধরা পড়ায়, এই অভিযোগও কেউ গুরুত্ব দিল না।
‘‘ওই অশ্লীল ছবির কাণ্ডে শিয়া লিউলির নামও তো ও-ই তুলেছিল?’’
‘‘তাহলে যদি ও বলে, বিশ্বাসযোগ্যতা তো শুন্যের কাছাকাছি।’
‘‘আমিও তাই মনে করি—সব ওর বানানো।’
‘‘তবু দেখি সামনে কী হয়।’’
…
‘‘তুমি বলছো আমি ছবি ছড়িয়েছি? প্রমাণ দাও। শুধু মুখের কথায় হবে না। আমি তো শেন ইয়োউনানকে ডেকে এনেছিলাম, তুমি? মুখে বলা বিশ্বাস করা কঠিন!’’ আমি তাকে পিছু হটার কোনো সুযোগ দিলাম না—আজ সব সমস্যা চিরতরে মিটিয়ে ফেলবো।
আমার কথায় সে বরং একটু স্বাভাবিক হয়ে বলল, ‘‘তুমি লু হুই ও লিউ ফেংকে ডেট করতে দেখেছিলে, চাইলে লিউ ফেংকে জিজ্ঞেস করলেই হবে।’’
‘‘ঠিক, ওদের দু’বার আমি দেখি, কিন্তু এতে প্রমাণ হয় কি? ওরা দুজন সম্পর্কে আছে, এটা শুধু আমি জানি এমন নয়। তুমি আর লু হুইয়ের বন্ধু গ্য চাওজুয়ানও তো আগেই জানো, চাইলে তোমরাই সহজেই কিছু করতে পারো।’’
ঝু হান রেগে চেঁচাল, ‘‘আমরা কেন এমন করব? আমাদের লাভ কী?’’
‘‘আমি কেনই বা করব? আমারই বা লাভ কী?’’ আমি একচুলও ছাড়লাম না।
আমি ঠান্ডা গলায় বললাম, ‘‘কিছু লোকের লাভ কম নয়। লু হুই স্কুল ছাড়ার পর, তার বন্ধু শুধু তার প্রেমিকই দখল করেনি, বরং তার জীবনও উন্নত হয়েছে। আগে পুরো শরীরে একশো টাকাও ছিল না, এখন ইল্যান্ডের জামা, ওনলির প্যান্ট, কলম্বিয়ার জুতো—সব মিলিয়ে হাজার টাকা ছাড়িয়ে গেছে। আরও আছে, শোনা যায় এবার তার টিউশনও লিউ ফেং দিয়েছে।’’
ওয়েন লিলির ব্র্যান্ড-জ্ঞান কাজে এল।
এতটুকু বলতেই সবাই বুঝে গেল আমি কী বোঝাতে চাই—বলতে গেলে, কেউই অতটা বোকা নয়।
আমি আগেই দেখেছি গ্য চাওজুয়ান আর লিউ ফেং কোথায় দাঁড়িয়ে আছে। সমস্যা হলো, লিউ ফেংয়ের বর্তমান প্রেমিকা যে অশ্লীল ছবির ঘটনায় জড়িত, সেটা সবাই জানে না, আমাদের ক্লাসের কয়েকজন ছাড়া।
তবে এই দুশ্চিন্তা বেশিক্ষণ থাকল না—লিউ ফেংয়ের মূর্খতা ও বেপরোয়া স্বভাবের জন্য আমাকে ধন্যবাদ দিতেই হয়।
তার মুখ কালো হয়ে গেল, আমি শেষ কথা বলতেই সে ভিড় ঠেলে চেঁচাতে চেঁচাতে আমার দিকে ছুটে এল, আমাকে ধরে ফেলতে চাইলো, ‘‘শিয়া লিউলি, তুমি কী করতে চাও?’’
আমি এক পা পিছিয়ে তার হাত এড়িয়ে গেলাম, হাসিমুখে বললাম, ‘‘লিউ ফেং, দয়া করে আবেগে গা ভাসিও না। আমি তো তোমার ও তোমার প্রাক্তন বান্ধবীর জন্য সত্যি অপরাধী খুঁজছি। আমি শুধু মুখে বলছি না, প্রমাণও দেবো। তখন চাইলে রাগ করো, চাইলে যার উপরে খুশি রাগ ঝাড়ো।’’
ভিড় থেকে চিৎকার উঠল, ‘‘ওকে বলতে দাও, ওকে বলতে দাও!’’
‘‘তুমি কিসের ভয় পাচ্ছ? কথা বলতে দাও!’’
‘‘তুমি কি আদৌ ছেলে? মেয়েদের গায়ে হাত তুলছো?’’
…
জনতার শক্তি অসীম, লিউ ফেং আমার দিকে রাগে তাকিয়ে থাকলেও কিছুই করার নেই।
‘‘এই সব গুজবে আমি নিজেকে নির্দোষ প্রমাণের মতো কোনো প্রমাণ পাইনি, তাই এতদিন চুপ ছিলাম। কিন্তু, নয় নম্বর শ্রেণির এক ছাত্র প্রিন্ট করতে গিয়ে দেখে দোকানের কর্মচারী কম্পিউটারে কিছু অশ্লীল ছবি দেখছে, চেনা মনে হওয়ায় ভালো করে দেখে—এটা লিউ ফেং ও লু হুইয়েরই ছবি, তাও অগণিত। ওই ছাত্র কৌতূহলী হয়ে উৎস জানতে চায়, কর্মচারী অকপটে বলে: গত বছর এক ছোট মেয়ে এসে এসব ছবি তিনশোর বেশি কপি করিয়েছিল, ঘটনাটা বিশেষ বলে তার মনে গেঁথে গেছে।’’
লিউ ফেংয়ের আগের রাগী মুখ এখন ফ্যাকাশে, নিচে উত্তেজনা চরমে।
‘‘ওকে ডেকে এনে সাক্ষ্য দিতে বলো!’’
‘‘ওকে দিয়ে দোষী খুঁজে বের করাও!’’
…
সবাই উত্তেজিত, যদিও অনেকেই কেবল ঝামেলা চায়।
ঠিক তখনই লিউ জিয়া এক মাথা সোনালি চুলের ছেলেকে নিয়ে ভিড় ঠেলে আমার পাশে এসে দাঁড়াল।
ছেলেটি স্পষ্টই মজার মানুষ, এত জনতার মুখোমুখি হয়েও ভয় পেল না, বরং হাত নাড়িয়ে বলল, ‘‘সবাইকে স্বাগতম! আমি হেংশান রোডের কপি শপের লু বিংচুয়ান। তোমরা কপি বা প্রিন্ট করতে এলে আমার নাম বলবে—সবকিছু বিশ শতাংশ ছাড়! সবাই আসবে, সবাই আসবে!’’
চারপাশে সবাই হেসে উঠল।
সবচেয়েও বড় বিপদ, সে নাকি কার্ডও বিলি করতে শুরু করল—এ কেমন আজব লোক!
আমি কপালে হাত দিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেললাম, ইচ্ছে করল তার কান ধরে বলি: দয়া করে পরিস্থিতিটা একটু বুঝো!