ষষ্ঠ অধ্যায়: নম্বর প্রকাশের পর

পুনর্জন্মিত গ্রীষ্মলতা 陶 মুও 3041শব্দ 2026-03-19 03:12:24

বাড়ি ফিরে আমি পুরনো খবরের কাগজ বের করলাম। আগের জন্মে শুধু খাবারের বাক্সের তলায় রাখার কাজে এগুলো ব্যবহার করতাম, নইলে কখনও মনোযোগ দিতাম না। দেখলাম, ঠিকই, সেখানে মাধ্যমিক পরীক্ষার ফলাফল জানার সংবাদ আছে, সঙ্গে ফলাফল জানার ফোন নম্বরও।

পরের দিন সকালে, আমি বারবার বললাম কিছু প্রয়োজন নেই, তবুও বাবা-মা তাদের বের হওয়ার সময় এক ঘণ্টা পিছিয়ে দিলেন, বললেন, আমায় এই গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে সঙ্গ দেবেন।

নয়টার আগে দুজনে আমাকে সান্ত্বনা দিতে থাকলেন—কম নম্বর পেলেও কিছু আসে যায় না, ভালো স্কুলে ভর্তি না-হলেও কিছু যায় আসে না। আসলে কি যায় আসে? শুধু যেন মন খারাপ করে আবার হাসপাতালে না যেতে হয়।

এত বোঝানোর পরও, তাদের কথায় একবিন্দু আশাবাদ নেই যে আমি ভালো করতে পারি। বোধহয় কল্পনাও করেননি।

নয়টা বাজতেই আমি ফোন করতে শুরু করলাম। সাধারণত কয়েক ডজন বার না ডায়াল করলে লাইনে যাওয়া যায় না। আধঘণ্টা চেষ্টার পরও পারলাম না।

বাবা বললেন, তিনি চেষ্টা করবেন, আমিও তখন সুযোগ নিয়ে বাথরুমে গেলাম।

বেরিয়ে এসে দেখি, বাবা-মা গম্ভীর মুখে সোফায় বসে আছেন।

কিছু কি খারাপ হয়েছে? এর তো কোনো কারণ নেই। সত্যিই যদি খারাপ হতো, তাহলে আমার বাঁচার মানে থাকত না।

চা-টেবিলের ওপর রাখা কাগজটা তুললাম—চীনা ১১২, সর্বোচ্চ ১২০; পদার্থ ৯৭, সর্বোচ্চ ১০০; গণিত ১১৬, সর্বোচ্চ ১২০; রসায়ন ৯৫, সর্বোচ্চ ১০০; ইংরেজি ১১৮, সর্বোচ্চ ১২০; রাজনীতি ও ইতিহাস ৫০, সর্বোচ্চ ৬০।

৬২০-র মধ্যে আমি পেয়েছি ৫৮৮, খারাপ তো হয়নি। নিশ্চয়ই...

বাবা বললেন, ‘‘লিউলি, নম্বরই সব নয়।’’

তাহলে কী সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ?

মা বললেন, ‘‘শুনেছি এ বছর পরীক্ষার প্রশ্নপত্র সহজ হয়েছিল।’’

আপনি কার কাছ থেকে শুনলেন?

বাবা যোগ করলেন, ‘‘হ্যাঁ, খুব সম্ভব সবারই ভালো হয়েছে, তাই ভর্তি হওয়ার নম্বর অনেক বেড়ে যাবে।’’

তবুও এতটা বাড়বে না। নচেৎ প্রশ্নপত্র প্রস্তুতকারকরা তদন্তের মুখে পড়বেন।

মা আবার—‘‘নম্বর বেশি হলেও, র‍্যাংকিং হয়তো ওপরে থাকবে না। শুনেছি এবার প্রধান স্কুলগুলোতে ভর্তি নম্বর কমপক্ষে ছয়শো পেরিয়েছে।’’

এটা কে ছড়াল? মোট নম্বর তো ৬২০, ছয়শো পেরিয়ে আবার ক’জন? ভূত-প্রেত ভর্তি হবে?

আমি এবার বুঝে গেলাম—লিউলির মান অনুযায়ী বাবা-মা বিশ্বাসই করেননি আমি ভালো করতে পারি। বরং এই ফলাফলের কারণ তারা প্রশ্নপত্র সহজ হয়েছে বলে ভেবেছেন। ভয়, আমি খুশি হয়ে পড়ে আবার ভর্তি নম্বর দেখে হতাশ হবো, মানিয়ে নিতে না পেরে আবার অসুস্থ হয়ে পড়ব।

‘‘ছোট লি, তোমার বাবা-মায়ের কথা কানে তুলো না। আমার নাতনি তো বরাবরই বুদ্ধিমতী, সে একবার ভালো করতে পারবে না?’’ দাদিমা ফলের থালা এনে বললেন, বাবা-মায়ের কথা শুনে তিনি খুশি নন।

পৃথিবীতে দাদিমা ছাড়া কেউ নেই, কৃতজ্ঞতায় তার দিকে তাকালাম।

‘‘অন্ধ বিড়ালও তো মরাপোকা ধরতে পারে, ছোট লি তো ক্লাস ওয়ানে একবার একশো পেয়েছিল!’’

সব কৃতজ্ঞতা উবে গেল—আমি ভালো করলেই বুঝি অন্ধ বিড়ালের কপাল! দাদিমা, আপনি এই কথা না বললেই ভালো হতো!

সকালের নম্বর-কাণ্ড এখানেই শেষ হল, আমি আর তর্ক করলাম না, ভর্তি নম্বরের জন্য অপেক্ষা করতে লাগলাম।

সন্ধ্যাবেলা জেঠু-জেঠিমা এলেন। আমার নম্বর শুনে জেঠু হাত চাপড়ে বললেন, ‘‘ছোট লি তো দারুণ করেছে!’’

বাবা-মাও এবার কিছুটা বিশ্বাস করলেন যে আমি সত্যিই ভালো করেছি।

অবশেষে একজন আমার কথা বুঝলেন!

জেঠু কাগজ দেখে বললেন, ‘‘এই নম্বর নিয়ে যেকোনো স্কুলে যাওয়াই যায়।’’

বাবা-মা-ও খুশি।

‘‘নম্বরটা ভুল হয়নি তো?’’ হঠাৎ জেঠি বললেন, ‘‘শুনেছি মাঝে মাঝে ভুল নম্বরও চলে আসে, যাচাই করলেই ধরা পড়ে যায়।’’

উফ্...ভালো নম্বর পাওয়া সহজ, কিন্তু সবাইকে বিশ্বাস করানো কত কঠিন!

জেঠু বলেন, ‘‘কিছু আসে যায় না, যাচাই না করলেই হল! কে আর কার জন্য যাচাই করবে?’’

মাস্টার্স ডিগ্রি নিয়ে মাধ্যমিক পরীক্ষা দিয়েছি, ভালো নম্বর পেলে আশ্চর্য কিছু নয়, তবুও এতটা অসহায় লাগবে ভাবিনি।

থাক, সোনা আগুনে পোড়ালেও ভয় পায় না।

আজ শুক্রবার, সোমবার স্কুলে যেতে হবে, আমি ইতিমধ্যেই বাড়ি থেকে বারো নম্বর স্কুলে যাওয়ার পথ জেনে নিয়েছি, দুটো স্টপেজ, হেঁটে গেলে পার্ক পেরিয়ে শর্টকাটে যাওয়া যায়, ত্রিশ মিনিট লাগবে।

শনিবার-রবিবার মায়ের দোকানে গিয়েছিলাম, ল্যাপটপে ইন্টারনেট চালিয়ে খেলা করলাম।

মা অবাক হয়েছিলেন, কারণ লিউলি সাধারণত দোকানে যেতে পছন্দ করত না, বরং সারা দিন বাইরে থাকত, আমি পুরোপুরি ঘরকুনো—নেট থাকলে কোথাও থাকাই যায়। লিউলির এই পরিবর্তনে মা বেশ খুশি, মেয়ে সারাদিন বাইরে থাকলে চিন্তা হয়।

সোমবার সকালে ভাতের জল খেয়ে বেরোলাম, নম্বর তালিকা দেখা তো বড় কথা নয়, আসল হচ্ছে সনদপত্র সংগ্রহ আর অন্যান্য আনুষ্ঠানিকতা জানা।

পুরোনো সহপাঠীদের এড়িয়ে চলার জন্য আগেভাগেই গেলাম, কথা বলার সময় গা-ছাড়া উত্তর দেওয়া এড়াতে চাই।

কিন্তু বুঝতে পারলাম, একটা বড় সমস্যা—নম্বর তালিকা কোথায় লাগানো আছে জানি না, জানি লিউলি নবম-সপ্তম শ্রেণির ছাত্রী, কিন্তু ক্লাস কোথায় তাও জানি না। ক্লাস খুঁজে পেলেও কিভাবে সনদপত্র বা আনুষ্ঠানিকতার কথা জিজ্ঞাসা করব জানি না।

‘‘লিউলি!’’ এক পনিটেল বাঁধা মেয়ে খুশিতে দৌড়ে এলো।

দুনিয়ায় র‍্যাফ্লেশিয়া ফুলেও মাছি আসে, বোঝা গেল লিউলিকেও সবাই অপছন্দ করে না।

আমি হাসলাম, আসলে তার নাম ভুলে গেছি।

সে হাসল, দুটো খরগোশের দাঁত বেরিয়ে এল, ‘‘তুমিও নম্বর তালিকা দেখতে এসেছ?’’

মেয়েটার চেহারা খুব সুন্দর না হলেও, চঞ্চলতা আর প্রাণশক্তিতে ভরা, প্রথম দেখাতেই মনে হল, সে খুব কথা বলে আর চঞ্চল।

‘‘হ্যাঁ।’’

‘‘তুমি কেমন করেছ? আমি পুরো গুবলেট করলাম,’’ ছোট খরগোশ দাঁতের মেয়ে মুখ কালো করল।

‘‘তেমন কিছু না।’’ আমি নির্লিপ্তভাবে বললাম।

সে বড় বড় চোখে তাকাল, মনে হয় লিউলি ‘তেমন কিছু না’ বললেও কেউ বিশ্বাস করে না।

‘‘আমি পেয়েছি চারশো সাতষট্টি, তুমি?’’ সে ছাড়ল না, মনে হল লিউলি ‘খারাপ’ আর ‘তেমন কিছু না’ মানে গুলিয়ে ফেলেছে, ঠিক করে দেওয়া দরকার।

‘‘পাঁচশো আটাশি।’’

‘‘তুমি মজা করছ!’’ ছোট খরগোশ দাঁত চেঁচিয়ে উঠল, যেন ভূত দেখেছে।

‘‘ফোনে জেনেছি, সত্যিই তাই।’’ ওর প্রতিক্রিয়ায় আমি অভ্যস্ত, গত কয়েকদিন বাড়ির লোক আমাকে যথেষ্ট মানসিক প্রশ্রয় দিয়েছে।

‘‘আমি বিশ্বাস করি না।’’ সে একেবারে রুক্ষ, একটুও মান রাখল না, আমায় টেনে নিয়ে বলল, ‘‘চলো, তালিকা দেখে আসি, তবেই বিশ্বাস করব।’’

যাক, পথ দেখাক, ভালোই।

তার পেছনে চললাম, তালিকা নোটিস বোর্ডে লাগানো, সময় তখনও কম, মাত্র দুজন ছেলে সামনে দেখছে, ছোট খরগোশ দাঁত ওদের চেনে না, বুঝলাম ওদের সঙ্গে পরিচয় নেই।

সে ব্যাকুল হয়ে আমার নাম খুঁজতে থাকল, আমিও চারশো সাতষট্টির সঙ্গে কার নাম মিলছে খুঁজলাম।

‘‘তুমি গোটা স্কুলে দ্বিতীয় হয়েছ!’’ ছোট খরগোশ দাঁতের চিৎকারে পাশের ছেলেরা চমকে উঠল।

তালিকার প্রথম দিকে চোখ রাখলাম—ভালোই, দ্বিতীয় নাম, পাঁচশো আটাশি—লিউলি। প্রথম, পাঁচশো একানব্বই—লিউ জিয়া।

হ্যাঁ, মন্দ নয়, লিউ জিয়া সত্যিই মাস্টার্স দিদিকে পেরিয়ে গেছে, বাহবা প্রাপ্য।

‘‘লিউলি, লিউলি, তুমি সত্যিই পাঁচশো আটাশি পেয়েছ!!’’ ছোট খরগোশ দাঁত আমার হাত চেপে ধরে চিৎকার করতে লাগল, মনে হল ও নিজেই এত নম্বর পেয়েছে।

‘‘এবার তো রং স্যার আনন্দে আত্মহারা হবেন। ভাবো তো, আমাদের সপ্তম ক্লাস, গোটা বারো নম্বর স্কুলে সবচেয়ে খারাপ, সবাই হেয় করে, সবসময় উদাহরণ দেয়; সেখানে কেউ মাধ্যমিকে পাঁচশো আটাশি, গোটা স্কুলে দ্বিতীয়! হাহাহা, একেবারে ভাগ্যের চাকা ঘুরে গেল।’’

ছোট খরগোশ দাঁত হাত-পা ছুঁড়তে লাগল, যেন লটারি জিতেছে।

চারশো চুয়াত্তর, চারশো উনসত্তর, চারশো সাতষট্টি—এবার পেলাম, ‘‘ডেং শাওয়েন—চারশো সাতষট্টি।’’

ছোট খরগোশ দাঁত সঙ্গে সঙ্গে ছুটে এসে আমায় সরিয়ে বলল, ‘‘তুমি নামটা পড়ো না, আমি খারাপ করলাম। ভেবেছিলাম তুমিও খারাপ করবে, তাই ব্যর্থতার গল্প ভাগাভাগি করব, কে জানতো তুমি কালো ঘোড়া হয়ে যাবে!’’

তুমি আমাকে দেখে এত খুশি হয়েছিলে, কারণ ভেবেছিলে আমিও কম নম্বর পেয়ে বসে আছি! দুঃখিত, তোমাকে হতাশ করলাম, তবে ওর মুখ দেখে মন খারাপ বলেই মনে হল না।

‘‘তুমি এত ভালো করেছ, বাড়িতে কেউ পুরস্কার দেবে বলেছে?’’ ডেং শাওয়েন কৌতূহলী মুখে জিজ্ঞেস করল।

‘‘না।’’ সত্যি, পুরস্কারের কথা মাথায়ই আসেনি, আগের জন্মে বাড়ির অবস্থা ভালো ছিল না, ভালো করলেও বাবা-মা শুধু দু-একটা প্রশংসা করতেন, ভালো রান্না করতেন, উপহারের দাবি করিনি কখনও।

ডেং শাওয়েন মুখ বাঁকালো, ‘‘ঠিকই তো, তুমি শূন্যও পেলে বাড়ি যা চাও পাবে। আমি তো গেছি, বলেছিলাম, জেলা স্কুলে সুযোগ পেলে মা আমাকে বেড়াতে নিয়ে যাবে, এখন নম্বর দেখো, কপালে নেই।’’

আমি ওকে সামান্য সান্ত্বনা দিলাম, বুঝলাম ডেং শাওয়েন আসলে বিশেষ মন খারাপ করেনি, ওর আসল চিন্তা বেড়াতে যাওয়া নিয়ে, জেলা স্কুলে ভর্তি হওয়া নয়।

‘‘ঠিক আছে, এবার তুমি ইংচাই স্কুলে যেতে পারবে!’’ ডেং শাওয়েন মুখে রহস্যময় হাসি।

বলে কী! কতজন জানে লিউলির লিন শু-কে পছন্দ করার কথা!